শনিবার, ২ জুন, ২০১২

দ্বাদশপদী কবিতা - ৩

আজকের আলোচনা শুরু করবো মাত্রা আর ছন্দ দিয়ে।

মাত্রা: বাংলা কবিতায় একটি স্বর উচ্চারণের নিম্নতম কালকে মাত্রা বলে। যেমন: হ্যাঁ, না, কি, বান্‌, ধান্‌ ইত্যাদি।

সকল অবস্থাতেই মুক্তস্বর একমাত্রার তাই এর হিসেবে কোন সমস্যা নেই কিন্তু বদ্ধ স্বর কখনো একমাত্রা আবার কখনো একাধিক মাত্রার। ছন্দ অনুযায়ী এই বদ্ধস্বরের মাত্রার হিসেব বদলে যায়! ধীরে ধীরে এগুলোও আসবে।

মুক্তস্বরের হিসেবে একমাত্রাকে '।' চিহ্ন দিয়ে আর বদ্ধস্বরকে '-' চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

বাংলা কবিতা মূলত তিন ধরণের ছন্দে লেখা হয়ে থাকে -

ক) স্বরবৃত্ত ছন্দ
খ) মাত্রাবৃত্ত ছন্দ
গ) অক্ষরবৃত্ত ছন্দ

স্বরবৃত্ত ছন্দ: স্বরবৃত্ত ছন্দে মুক্তস্বর ও বদ্ধস্বর দু'টোই একমাত্রা বহন করে। যেমন:
পর্ব: কবিতার প্রতিটি চরণে সমমাত্রার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশই হলো পর্ব। পঙ্‌ক্তির শেষের পর্বাংশকে অতিপর্ব বলা হয় সাধারণত যার মাত্রা সংখ্যা পর্বের মাত্রা সংখ্যা থেকে কম হয়ে থাকে। আর এ ধরনের পর্বাংশ পঙ্‌ক্তির শুরুতে থাকলে তাকে বলা হয় উপপর্ব।
যখন ওরা অপিশে যায় কিংবা চালায়
তুমুল দোকানদারি
তখন আমি ঢেউ সাজানো নদীর বুকে
দিব্যি জমাই পাড়ি।
(যখন ওরা - শামসুর রাহমান)
মাত্রা বিন্যাস:

এখানে চার মাত্রার চারটি পর্ব এবং দুই মাত্রার একটি অতিপর্ব দিয়ে পঙ্‌ক্তি গঠিত হয়েছে। সাথে সাথে লক্ষণীয় যে শামসুর রাহমান একটি পঙ্‌ক্তি ভেঙে দু’টি লাইন করেছেন। কিন্তু পর্ব সংখ্যা প্রতি দুই দুই লাইনে সমান রেখেছেন।
এটা কিছু অপূর্ব নয়, 'ঘটনা: সামান্য খুবই',
শঙ্কা যেথায় করো না কেউ সেইখানে হয় জাহাজ-ডুবি।
(বোঝাপড়া, ক্ষণিকা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
মাত্রা বিন্যাস:


এখানে রবিঠাকুর প্রতি পঙ্‌ক্তিতে ৪ মাত্রার দু'টো পর্ব এবং ৮ মাত্রার একটি অতিপর্ব রেখেছেন।

আজকের আলোচনা এখানেই শেষ করি।

সবশেষে আজকেও একটা দ্বাদশপদী দিলাম। আজকের এই কবিতা স্বরবৃত্তছন্দে ৪ + ৪ + ৪ এ লেখার চেষ্টা করেছি। আপনারা এটার বিশ্লেষণ করে এর ভুল-ত্রূটি ধরিয়ে দিলে খুব ভালো লাগবে।
বাংলাদেশ

পোড়া লাশের মাঝ থেকে দেশ ওঠে জেগে
এক বাংলাদেশ। ভালোবাসা আর আবেগে
ভেসে থাকে পৃথিবীর মাঝ সবিস্ময়ে!
আর শত্রুদল একে একে যাবে ক্ষয়ে!
সিংহ-পুরুষ এক মুজিবের প্রবারণে
বাঙাল, সাঁ'তাল, ওঁড়াওঁ, গারোর জাগরণে
একে একে ভেসে গেল সব শত্রুর বলঃ
পাকি আর ওর রাজাকার ভাই! হারামির দল!
আমার সোনার বাংলা মায়ের আছে কি ক্ষয়?
চিৎকার করে বল্‌, 'জয় বাংলা!', বল, 'বাংলার জয়!'
জন্ম আমার বাংলার বুকে, যেন মরি
এ মাটিতে। এ মোর স্বর্গ! এ মোর হরি!

১ জুন, ২০১২; ঢাকা
দেবাশিস্‌ মুখার্জি

উৎসাবলি:
১) নূতন ছন্দ পরিক্রমা - প্রবোধচন্দ্র সেন
২) বাংলা কবিতার ছন্দ - মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
৩) বাংলা ছন্দের রীতি, রূপ ও বিকাশ - শাজাহান ঠাকুর
৪) হাসানআল আব্দুল্লাহ এর ব্লগ (মুক্তমনা)

বুধবার, ৩০ মে, ২০১২

দ্বাদশপদী কবিতা - ২

গত পোস্টটি পরবার পর অনেকেই অনেকেই যে কবিতার ব্যাকরণ নিয়ে পোস্ট দিলে ভালো হয়; কারণ ব্যাকারণের ব্যাপারগুলো তাদের কাছে কিঞ্চিৎ দুর্বোধ্য মনে হয়েছে। কিন্তু শুধুই ব্যাকরণের কচকচানি নিশ্চই ভালো লাগার কথা না। তাই আমি ঠিক করেছি আমার এই ধারাবাহিকভাবে দ্বাদশপদী কবিতা পোস্টের সাথে সাথে একটু একটু করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো।

বাংলা স্বর বা ধ্বনিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

১. বদ্ধস্বর
২. মুক্তস্বর

বদ্ধস্বর:
যে সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভ মুখের প্রবহমান বাতাসকে আটকে দেয় তাদের বদ্ধস্বর বলা হয়। যেমন : আঁক্‌, বাঁক্‌, কর্‌ (করো কিন্তু না), লড়্‌ (লড়ো কিন্তু না) ইত্যাদি।

মুক্তস্বর:
যে সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখের প্রবহমান বাতাস জিভের কোনো বাধা ছাড়াই বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে তাদের মুক্তস্বর বলে। যেমন: লড়ো, করো, নদী, ইত্যাদি।

উপরের উদাহরণগুলোর সবই ছোট ছোট শব্দ বা ধ্বনি নিয়ে দিলাম। বড় বড় শব্দ নিয়ে দিলে ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হবে:

বৃন্দাবন = বৃন্‌ + দা + বন্‌

এখানে বৃন্‌ বদ্ধস্বর, দা মুক্ত স্বর, এবং বন্‌ বদ্ধস্বর।

আবাহন = আ + বা + হন্‌

এখানে আ মুক্তস্বর, বা মুক্তস্বর, এবং হন্‌ বদ্ধস্বর।

কিন্তু আবাহনী = আ + বা + হ + নী

আ মুক্তস্বর, বা মুক্তস্বর, হ মুক্তস্বর (খেয়াল করে দেখুন বিশ্লেষণে হ এর নীচে কোন হসন্ত দেই নি), এবং নী মুক্তস্বর।

স্বরের ব্যপারটা পরিষ্কার হয়ে গেলেই মাত্রায় প্রবেশ খুব সহজ হয়ে যাবে। মুক্তস্বর সবসময়েই একমাত্রার, তাই একে নিয়ে কোন সমস্যাই হয় না। কিন্তু বদ্ধস্বর কোন কোন ছন্দে একমাত্রার আবার কোন কোন ছন্দে দুই মাত্রার।

স্বরের ব্যাপারটা আগামী পোস্টে আলোচনা করবো। তবে তার আগে আরো দু'টি ব্যাপারে কথা বলে নিইঃ

পয়ার: চতুর্দশ অক্ষরের ছন্দ , বাংলা পদ্যে সর্বাধিক প্রচলিত ছন্দবিশেষ। যেমন:

মঙ্গলকাব্যে ‘বিজয় গুপ্ত’ ‘হরিদত্ত’ সম্পর্কে বলেছেন

রথমে রচিল গীত কানা হরিদত্ত
মূর্খে রচিত গীত না জানে মহাত্ম্য
এ কাব্যের ছন্দ মূলত অক্ষরবৃত্ত পয়ার ছন্দ। যে ছন্দে মঙ্গলকাব্য রচিত তাকে লঘু বা দ্বিপদী পয়ার ছন্দ বলা হয়েছে। এর প্রতিটি পদ আট ও ছয় মাত্রায় বিভক্ত।

আজ এইটুকুতেই থামি এবং মূল পোস্টে যাই। smile :) :-)
চৈত্রকোল

আজ নদখানি জলহীন, ধুধু করে বালু,
মাঝি দাদার লগিখানা আর নাই চালু।
জেলেরা গ্যাছে মরে, নাই কারো খোঁজ।
শৈশবের স্মৃতিরা মনে জাগে রোজঃ
গ্রামখানির পাশ ঘেঁষে যেত নদ চৈত্রকোল,
নৌকোর মাঝে বসে আমি খেতাম যে দোল!
কাশফুলের সাদা মেশে আকাশের নীলে!
সকালেতে স্নান ছিল সব ভাই-বোন মিলে।
ভাই আর বোন গামছা করে ছোট মাছ ধরে
সব মিলে খেলা করে দিতেম যে ছেড়ে!
জল ছিল টলমলে, ছিল না তো কাঁদা,
বালু 'পরে আলো পড়ে: চিকমিক সাদা!

২৯ মে, ২০১২; ঢাকা
দেবাশিস্‌ মুখার্জি

সোমবার, ২৮ মে, ২০১২

দ্বাদশপদী কবিতা - ১

'দ্বাদশপদী' নামটা শুনে কি ভ্রু কুঁচকে গেল?? কিছুটা তাইই। বাংলা সাহিত্যে এরকম বস্তুর নাম খুব একটা শোনা যায় নি। এক-দু'জন যদিও বা দুয়েক বারের জন্য এই শব্দটা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তারা মজা করতেই করেছেন, ব্যাপারটাতে কোন গুরুত্ব দেন নি। আমি বেশ কিছুদিন ধরেই এরকম একটা ব্যাপার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছি কিন্তু ব্লগে কোন পোস্ট দেবার সাহস পাই নি। আজ অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে পোস্ট দিয়েই ফেললাম। এটা শুধুই পরীক্ষাপর্ব, তাই অনুগ্রহপূর্বক কেউ গাল দিবেন না।

আমি যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে নিয়ে দ্বাদশপদী কবিতাকে দাঁড় করানোর পরীক্ষা চালাচ্ছি সেগুলো হলঃ
১) ১২ পঙ্‌ক্তিতে বিন্যস্ত
২) প্রতি পঙ্‌ক্তিতে ১২ মাত্রা
৩) অক্ষরবৃত্ত ছন্দ
৪) পর পর দুই চরণে অন্ত্যমিল
৫) কবিতার বিন্যাস ৬+৬ কিংবা ৪+৪+৪ কিংবা ৮+৪ কিংবা ৫+৭ সহ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে


প্রিয়া

প্রিয়া, তুমি হও আজ অনিরুদ্ধা,
আমার হৃদয়ে তুমি শুধু শুদ্ধা
নীলয়-দুন্দভি কাঁপে তব আশে,
তব নাম বাজে মোর প্রতি শ্বাসে!
তব কাছে অঘ প্রেমখানি মোর?
অঘর য়েও জিগীষা অঘোর।
এ প্রেম শাশ্বত, শ্যামল, অব্যয়!
যদিবা হারাই জাগে মনে ভয়!
অঘোষ এ প্রেম হয় না শ্রবণ?
মোর হৃদে জ্বলে খাণ্ডব-দহন।
তবু হৃদ জাগে তব জয়-আশে,
মন শুধুই তোমা ভালোবাসে!

২৭ মে, ২০১২
(পরিমার্জনঃ ০১ মে, ২০১৩)
দেবাশিস্‌ মুখার্জি