সোমবার, ২ এপ্রিল, ২০১২

‘কেয়া পাতার নৌকো’ – ভারতীয় জি-বাংলা চ্যানেলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বিকৃত করবার অপপ্রয়াস

কোলকাতা ভিত্তিক ভারতীয় জি-বাংলা আমাদের বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়। আমাদের দেশের বিভিন্ন চ্যানেল যখন মান সম্পন্ন অনুষ্ঠান বানাতে ব্যর্থ হয়ে দর্শক ধরতে পারছে না, তখন সেই দর্শকদের একটা বিশাল অংশ টেনে নিয়েছে ওপার বাংলার বিভিন্ন বাংলা চ্যানেল। ওরা যে খুব বেশি মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান বানাচ্ছেন তা না, তবে তারা দর্শক ধরে রাখবার ব্যাপারে খুবই কৌশলী। আর সেই কৌশলের সহজ শিকার হয়ে আমাদের দেশের মা-বোন-মাসি-পিসি-কাকি-মামি-বোন-বউ-মেয়েরা ভারতীয় বাংলা চ্যানেলে বুদ হয়ে আছেন!

ওপার বাংলার বাংলা চ্যানেলগুলোর মাঝে জি-বাংলা বাংলাদেশে অত্যধিক জনপ্রিয়। আমাদের দেশের মেয়েরা যারা সন্ধ্যা নাগাদ ফ্রি হয়ে যান এবং ঘরে বসেই অবসরটা কাটান তাদের বিশাল একটা অংশ জি-বাংলার সিরিয়ালের দর্শক কাতারে সামিল হন। সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্তই ওতেই আটকে থাকেন চুম্বকে আটকানো লোহার মতন! বিভিন্ন সিরিয়ালের মাঝে অগ্নিসাক্ষী, কেয়া পাতার নৌকো, কনকাঞ্জলি, সাত পাকে বাঁধা বেশ জনপ্রিয়। এই দর্শকদের বিশাল একটা অংশই এইসব সিরিয়ালগুলোকে মেনে নিয়েছেন নিজ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। কিন্তু তার বিনিময়ে কী পাচ্ছেন?? সস্তা বিনোদন!! আর কী?? এর সাথে আরও পাচ্ছেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ভুল ধারনা। আর এই কাজটা করে যাচ্ছে কেয়া পাতার নৌকো নামের সিরিয়ালটা!

কেয়া পাতার নৌকো সিরিয়ালটার উৎস হল প্রফুল্ল রায়ের দারুন একটা উপন্যাস কেয়া পাতার নৌকো; যদিও সিরিয়ালের রাইটার প্রফুল্ল রায় নন। এ উপন্যাসটিতে ঔপন্যাসিক দারুন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান) ত্যাগ করে পশ্চিম বঙ্গে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের নিদারুন কষ্ট। বাংলার বাঙালেরা ওপার বাংলার ঘটিদের কাছে কীভাবে তাচ্ছিল্যের শিকার হয়েছেন তা ফুটে উঠেছে উপন্যাসটিতে, আরো ফুটে উঠেছে গত শতাব্দির চল্লিশ থেকে ষাট দশকের পূর্ব বাংলার অপূর্ব চিত্রায়ন। কিন্তু জি বাংলার সিরিয়াল কেয়া পাতার নৌকো এ শুধুমাত্র নামটা ঠিক রাখা হলেও চিত্রকল্পে ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনের নামে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ইতিহাস ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে করা হয়েছে পরিহাস!


উপক্রমণিকায় অনেক কথাই হল। এবার চলে যাই মূল কথায়। সিরিয়ালটিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে অপপ্রয়াস করবার প্রচেষ্টাগুলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করছিঃ

১) পূর্ব পাকিস্তানের সেরা ছাত্র শৌর্য চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে ছদ্মবেশে যুদ্ধ করেন। গালে আলগা দাড়ি লাগিয়ে হয়ে ওঠেন মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল। আর অন্যদিকে হিন্দু শৌর্য চৌধুরীর মুসলমান প্রেমিকা নার্গীস ওরফে কিরণমালা মুক্তিযুদ্ধ করতে নাম নেন সুলেখা দেবি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধ করতে যে হিন্দুদের মুসলিম আর মুসলিমদের হিন্দু পরিচয় নিতে হত এরকমটা জানা ছিল না!!

২) মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল তার গালে আলগা দাড়ি লাগিয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করতেন। আলগা দাড়ি!! অথচ আমাদের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধকালীন সময়ে কবার দাড়ি কামানোর সুযোগ পেয়েছেন সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

৩) কেয়া পাতার নৌকো তে মুক্তিযোদ্ধাদের পোষাকের ব্যাপারটা চোখে লাগার মতন। ওখানে দেখায় মুক্তিযোদ্ধারা পায়জামা আর পাঞ্জাবি পড়ে যুদ্ধ করেন!! পুরো সিরিয়াল জুড়েই এমন একটা ভাব যেন পায়জামা-পাঞ্জাবি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পোষাক, আর নিত্যপরিধান কর্তব্যের মাঝে পড়ে!! অথচ আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধারা শুধুমাত্র লুঙ্গি পড়া অবস্থায় দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।

৪) আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান পুরুষদের চেয়ে কোন অংশেই কম না। তারা বিভিন্ন জায়গাতে সক্রিয়ভাবে অংশ করেছেন। তাদের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়েই বলছি আমাদের নারীরা মুক্তিযুদ্ধের অনেক অবদান রাখলেও ফ্রন্ট লাইন যুদ্ধে একটু কম সক্রিয় ছিলেন যা তৎকালীন সমাজে এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল; কিন্তু কেয়া পাতার নৌকো তে দেখানো হয় মুক্তিযুদ্ধে নারী ইউনিটগুলোই পুরুষ ইউনিটের চাইতে বেশি সক্রিয় ছিল!! নারী ইউনিটের ট্রেনং দেন পুরুষেরা, দলে থেকে নারীদের সাহস যোগান পুরুষেরা কিন্তু সেই পুরুষেরা যুদ্ধের সময়ে যান না!!

৫) এখানে দেখানো হয় কীভাবে অসীম সাহসিকতায়(!!) কিরণমালা খানসেনাদের কাছ থেকে যুদ্ধের কৌশল আর মানচিত্র জয় করে। এদের যে আমাদের দেশের গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কে কোনই ধারণা না তা আর বুঝতে বাকি নেই।

৬) পুরো যুদ্ধজুড়ে মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ও তার সহযোদ্ধারা পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে রিভলভার নিয়ে!!

৭) কেয়া পাতার নৌকো তে খান সেনাদের দেখানো হয় দাড়িওলা ও আলখাল্লাসম পাঞ্জাবি পরিহিতাবস্থায়। খানসেনাদের এইরূপ এই প্রথম দেখা!!

৮) কেয়া পাতার নৌকো তে আরো দেখানো হয় আর সারাদেশব্যাপী বাঙালিদের উপর আক্রমণ করে মুলত পুলিশেরা, পাক-বাহিনী না। এবং পুলিশেরা মূলত এদেশি। অথচ ২৫ মার্চ রাতেই আমাদের পুলিশ ভাইদের নির্মমভাবে হত্যা করে পাকসেনারা। খুব কম পুলিশই ব্যারাক থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছেন।

৯) সিরিয়ালটিতে খানসেনারা সবাইই বাংলায় পারদর্শী এবং বাংলাতেই বাক-চিৎ করেন!!

১০) সিরিয়ালটির এক পর্যায়ে কিরণমালাকে তার প্রাক্ত স্বামী দাড়িওলা রাজাকার কাবুল শেখ ও পাঞ্জাবি পরিহিত খানসেনারা আটক করে এবং গুলি করে। কাবুল শেখ নিজে কিরণমালার বুকে ও পেটে গুলি করে। কিন্তু এত গুলি খেয়েও কিরণমালা মরে নি!

১১) এবং সর্বশেষ গতকাল দেখানো হয়েছে এক রাজাকার এক হিন্দু বনেদি পরিবারকে ভারত চলে যেতে বলে। কিন্তু তার বাড়ি সে দখল করতে চায় না বরং দু'লাখ টাকা দিয়ে কিনতে চায়!! সত্যিই রাজাকারদের এই মহানুভবতায় আমি বিস্মিত না হয়ে পারলাম না!!!

এরকম আরোও অনেক অসামঞ্জস্যতার মাধ্যমে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করা হয়েছে এবং ওই মহান যুদ্ধের ইতিহাসকে করা হয়েছে বিকৃত।

কেয়া পাতার নৌকো সিরিয়ালটিতে যদিও ডিসক্লেইমার দেয়া হয় যে ঐ সিরিয়ালটির সকল ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক, কোন ঘটনা কিংবা ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা নিহায়েতই কাকতালীয়!! কিন্তু ঘটনা হয় যখন একটা দেশ ও জাতি এবং সেই দেশ ও জাতির মুক্তির ইতিহাস তখন আর একে কাকতালীয় বলে চালানোর অবকাশ থাকে না। আমি তীব্রঘৃণাসহকারে ধিক্বার জানাই ভারতীয় জি-বাংলা কর্তৃপক্ষকে এবং বাংলাদেশের দর্শকদের এই সিরিয়াল ও জি-বাংলা চ্যানেলটিকে বর্জণের আহ্ববান জানাই।

বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

নষ্ট ছেলে!!

নষ্ট ছেলে!!


সকাল কাটে মুনার সাথে,
আর সন্ধ্যেবেলা
আমার হাতটা থাকে লুনার হাতে।
একই বুলি চালিয়ে যাই
প্রেম নাটকের মোলাকাতে।

কাজের শেষে,
প্রেমের শেষে
ফিরি ঘরে।
সব করে
বিছানায় যাই।
চোখটা বুজি, ঘুমতো নাই!

চোখের পাতায় তোমার ছবি,
তোমায় ভেবে মস্ত কবি।
মাথার ভেতর কাব্য বুনি,
আমি জানি আমি খুনি।
খুন করেছি ভালোবাসা,
খুন করেছি তোমার আশা।

করে জ্বালা হৃদের ক্ষতেঃ
এসেছিলে আমার হতে,
করতে আমায় তোমার স্বামী।
ফিরিয়েছি তোমায় আমি।
আমার ছিল পকেট ফাঁকা।
শেষ সম্বল পঞ্চাশ টাকা,
তাই দিয়ে বলেছি তোমায়
চলে যাও ফেলে আমায়।

দেবার আর ছিল না কিছু...
তুমি ফিরে দেখছিলে পিছু,
সেদিন আমি হয়েছিলাম কাঠ।
আজ আমার ম্যালা টাকার ঠাঁট!

সবই আছে, ভালোবাসা ছাড়া...
আজ আমি তোমায় হারা...
সময় কাটে মুনাদের খেলে,
আজ আমি নষ্ট ছেলে!



১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১২
দেবাশিস্‌ মুখার্জি

মঙ্গলবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

আগুনঝরা ফাগুনের দিন

বিশ্বের অনেক দেশে আজকের দিনে পালন করা ভ্যালেন্টাইন'স ডে এর আমাদের দেশে আগমন ঘটে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নামে। এই নামের আবির্ভাব খুব একটা পুরোনো না। আমার ছোটবেলায় এমন কোন নাম কানেও আসে নি। তবে একটু একটু করে ঠিকই শুনেছিলাম জয়নাল, জাফর, দীপালি সাহাদের নাম। সেই '৮৩ সালে আমার জন্মও হয়নি। বীর শহীদদের সেই গল্পের একটু-আধটি শুনেছিলাম এক বড়ভাইয়ের কাছ থেকে। তারপরে চাপা পড়ে যাওয়া। গত বছর শ্রদ্ধেয় কাঠমোল্লা ভাই এর পোস্ট থেকে বিস্তারিত জানতে পারি।

আজ ভালোবাসা দিবসের ডামাডোলে চাপা পড়ে যায় আমাদের বীর ভাই-বোনদের আত্মাহুতির গল্প। আজ আমরা খেলো গণতন্ত্র পেলেও আজও কৃতজ্ঞতা জানাতে পারিনি ঝরে পড়া সেই রক্তকে।

দীপালি সাহা
ঘুমায় আহা
ঘুমায় ঘুমাক ঘুম রে
আধফোঁটা ফুল
ফুটলো না ভুল
মরন দিল চুম রে!
১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা গ্রহণ করেন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। রাজনীতি হয় নিষিদ্ধ, আর গণতান্ত্রিক অধিকার হয় রহিত। পোস্টার সাঁটাও নিষিদ্ধ ছিল। এই করতে গিয়ে কয়েক ছাত্রকর্মী ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হন। এর মধ্যেই ছাত্রসমাজ বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে। দমন-পীড়নের কারণে সেগুলো খুব বড় আকার ধারণ করেনি। আর সরকারের তরফ থেকে সেন্সরশীপ তো ছিলই। তবে ৮২ শেষের দিক থেকেই ছাত্র সংগঠনগুলো সংগঠিত হতে থাকে। এর মধ্যে ডঃ মজিদ খানের নেতৃত্বে নতুন শিক্ষানীতি রচিত হলে এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। আপাতভাবে এই আন্দোলন শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে হলেও এটি ছিল মূলত স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের সূচনা।



ছবিঃ স্বৈরশাসন বিরোধী চিকা মারা!
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন একত্রিত হয়ে এগিয়ে যায় সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে। ঐ আন্দোলনে মূখ্য ভূমিকা রাখা ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলঃ

১) বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (আওয়ামী লীগপন্থী)
২) বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন
৩) বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদপন্থী)
৪) জাতীয় ছাত্রলীগ
৫) বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি
৬) গণতান্ত্রিক ছাত্র ইউনিয়ন
৭) বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বাসদপন্থী)
৮) ছাত্র ঐক্য ফোরাম
৯) জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বড় সংগঠন হলেও পরিষদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং প্রথমদিকে এই আন্দোলন থেকে দূরে ছিল।

১১ জানুয়ারি, ১৯৮৩ শিক্ষানীতির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'বটতলা' থেকে শিক্ষাভবন অভিমুখে মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং কর্মসূচী সংগঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনসংযোগ চলতে থাকে। একদম শেষ মুহূর্তে এসে সামরিক সরকার মূল রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে ছাত্রসংগঠনগুলোর উপর কর্মসূচী প্রত্যাহারের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। সংগ্রাম পরিষদের সভায় অধিকাংশ সংগঠনই মিছিল বাদ দিয়ে শুধু সমাবেশ করার পক্ষে মত দেয়। তিনটি সংগঠনের আপত্তি সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরদিন ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ-স্কুল থেকে হাজার-হাজার ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে প্রাঙ্গনে অবস্থান নিতে থাকে। সেখানে নেতৃবৃন্দের পক্ষে জাসদপন্থী ছাত্রলীগের সভাপতি মুনীরউদ্দিন আহমদ ঘোষণা দেন যে ঐদিন আর মিছিল হবে না। মিছিল হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি।

মিছিল বাতিলের ঘোষণা্য মোহন রায়হান নামের এক ছাত্র চিৎকার করে প্রতিবাদ জানান। শেষ পর্যন্ত মূল নেতৃবৃন্দ ছাড়াই মোহন রায়হানের নেতৃত্বে সমাবেশের একটা বড় অংশ শিক্ষাভবনের সামনের সড়কদ্বীপ পর্যন্ত যা্ন। তারা ঐ জায়গায় কিছুক্ষণ অবস্থান করেন এবং কোন অঘটন ছাড়াই ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। জানা যায় যে ডি,জি,এফ,আই, মোহন রায়হানকে ধরে নিয়ে যায় এবং অনেকদিন পর্যন্ত তার আর কোন খবর পাওয়া যায় নি।

২৬ জানুয়ারি, ১৯৮৩ খন্দকার মোঃ ফারুক সহ তিনজন ছাত্রনেতা গ্রেফতার হওয়ায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ৩০ জানুয়ারি দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই ডাক অনুযায়ী ৩০ জানুয়ারি, ১৯৮৩ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) ও নারায়ঙঞ্জের তোলারাম কলেজে স্বতস্ফূর্তভাবে ধর্মঘট পালিত হয়।

৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৩ শিক্ষানীতি বাতিল, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ছাত্রবন্দীদের মুক্তির দাবিতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে 'বিক্ষোভ দিবস' হিসেবে পালিত হয়। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণে ছাত্রদের সমাবেশ হয়। এই সভার সভাপতি আখতারুজ্জামান ১৪ ফেব্রুয়ারির জন্য ঘোষিত কর্মসূচি বহাল থাকার কথা ব্যক্ত করেন।




ছবিঃ ১৪ ফেব্রুয়ারি সমাবেশ এর প্রচারণায় পোস্টার!
১৪ই ফেব্রুয়ারি তারিখেও বিপুল পরিমাণ ছাত্র-ছাত্রী জড়ো হন। মিছিল শুরু হয় শিক্ষাভবন অভিমুখে। তবে সেখানে পৌঁছে সমাবেশ কিছুটা এলোমেলো হয়ে যায়। নেতৃবৃন্দ বিচ্ছিন্নভাবে ছাত্রদেরকে মিছিল নিয়ে বাহাদুর শাহ পার্কের দিকে যেতে বলেন; কিন্তু অনেকের কাছেই সেই বার্তা পৌঁছেনি। অনেকেই শিক্ষাভবন ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন। আবার অনেকে বাহাদুর শাহ পার্কের দিকে রওনা হলেও বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্যত্র চলে যান। এক সময় পুলিশ শিক্ষাভবনের সামনে ও শিশু একাডেমির ভিতরে গুলি চালায়। আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীপালি সাহা, জাফর, জয়নাল সহ নাম না জানা অনেকে। পুলিশ অনেকের লাশই গুম করে ফেলে, তাই আর নিহতের সঠিক সংখ্যাটা জানা যায় না।

মেডিকেল কলেজ থেকে একজনের লাশ উদ্ধার করে ছাত্ররা। বিকেলে অপরাজেয় বাংলার সামনে জানাজা শেষে লাশ নিয়ে মিছিল করতে চায় ছাত্ররা। জাতীয় নেতৃবৃন্দ এসে লাশ দেখে যাবার পরই লিশ ও বিডিআর এসে কলাভবন ও রোকেয়া হলের মাঝের রাস্তা জুড়ে অবস্থান নেয়, সংগ্রামী ছাত্রদের উপর চড়াও হয়। কেউ কেউ চারুকলার ভিতর দিয়ে পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ছাত্রই কলাভবন বা ক্যাম্পাসের অন্যান্য ভবন থেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। পুলিশ তাদের পেটাতে পেটাতে শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে যায়। এর পরপরই ভীত সামরিক জান্তা এরশাদ কার্ফিউ জারি করে এবং পুলিশ ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন ছাত্রহল থেকে নির্বিচারে ছাত্রদের গ্রেফতার করতে থাকে।

১৫ ফেব্রুয়ারি হরতাল ডাকা হয়। এদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হন আউয়ুব আর কাঞ্চন। আর শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোলরুমে আটকে রাখা ছাত্রদেরকে সামরিক আদালতে বিচারের উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে কয়েকদিনে অনেকে ছাড়া পেলেও, কাউকে কাউকে জেল খাটতে হয়।

১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে ৪৯ জন ছাত্র পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান বলে জানা যায়। কিন্তু অনেকেরই লাশ পাওয়া যায় নি। শিশু একাডেমির সামনে জমিয়ে রাখা লাশের স্তূপ থেকে লাশ নেবার জন্য ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এম্বুলেন্স নিয়ে আসলে পুলিশ তা হতে দেয় নি। সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনী লাশ গুম করে ফেলে। এই আন্দোলনে সনহতি প্রকাশ করা অনেক শিক্ষক-অভিভাবক পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হত। গ্রেফতারকৃত হাজারখানেক ছাত্র চরম নির্যাতনের শিকার হন। শিশু একাডেমিতে যাওয়া শিশু ও তাদের অভিভাবকেরাও পুলিশের গুলি হতে রক্ষা পান নি।

এই আন্দোলন শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চট্টগ্রামের ছাত্র ও সাধারণ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন। উনারা চট্টগ্রাম শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জরো হন। পুলিশ সমাবেশ ও বিক্ষোভে গুলি চালায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন ছাত্র ও একজন কিশোর প্রাণ হারান। অনেকি আশঙ্কাজনকভাবে আহত হত। পরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে হরতাল পালিত হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভরত ২৭ জন ছাত্র-শিক্ষক গ্রেফতার হন।

ঢাকার খবর পাওয়ার পরপরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিশাল মিছিল নিয়ে রাজশাহী শহরের দিকে এগিয়ে চলেন। বিভিন্ন স্থানে বাধা দিয়েও পুলিশ এই মিছিল থামাতে পারে নি। ছাত্র সমাবেশে পুলিশ গুলি চালায়। এতে একজন শহীদ হন। অনেকেই আহত হন।

হত্যা ও চরম নির্যাতনের পথ ব্যবহার করে এরশাদ সরকার সাময়িকভাবে এই আন্দোলন দমন করতে সমর্থ হয়। কিন্তু এই প্রথম ফাগুনের ছাত্র আন্দোলন দিনে দিনে ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশব্যাপী সকলের মাঝে। ১৯৯০ এ এসে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটে।

আজ এই স্বৈরাচারী এরশাদই ক্ষমতায় ফিরে এসেছে গণতন্ত্রের লেবাসে। দেশের অনেক মানুষের কাছে আজও নাকি প্রেসিডেন্ট হিসেবেই পরিচিত। সবাই ফুলে যায় এই এরশাদ তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কত ভাই-বোনের তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। নাম সর্বস্ব গণতন্ত্রের জোয়ারে আজ বৃথা যেতে বসেছে দীপালি সাহাদের রক্ত।

লেখাটা শেষ করছি শ্রদ্ধেয় আরিফ জেবতিক ভাই এর একটা আগুন ঝলসানো বক্তব্য দিয়েঃ

14 ফেব্রুয়ারি,2007

দীপালি, কাঞ্চন, জাফর, জয়নালের উত্তরপুরুষেরা আজ মগ্ন ভালোবাসায়। এক জারজ পুরুষ আমাদের কে ভালোবাসার দিন এনে দিয়েছেন। তার আগে কেউ এদেশে ভালোবাসতো না। আমরা তাই নতুন করে ভালোবাসা শিখছি।

পয়লা ফাল্গুনের হলুদ রেখে আমরা পরদিন থেকে ভালোবাসাবাসি করব।

আমরা আজ বইমেলায় গিয়ে ইমদাদুল হক মিলনের পর্ণো বই কিনব,
রমনা পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, জিয়ার মাজার আর সাইবার ক্যাফের বুথে প্রেমিকার স্তন টিপব,
কে জানে ভাগ্য ভালো থাকলে কোন বন্ধূর বাসায় উপগত হয়ে সঙ্গম সুখও পেতে পারি।
আমরা আজ ভালোবাসার বন্যায় ভেসে যাবো।

দীপালি, কাঞ্চন, জাফর, জয়নালের মুখ আর আমাদের মনেও পড়ে না...

উপরের আলোচনার শেষে দেখে নিন আগুনঝরা সে উত্তাল ফাগুনের কিছু লিফলেট ও ছবিঃ
















এই পোস্টটি সম্পন্ন করতে কৃতজ্ঞতা জানাই -
১) ব্লগার কাঠমোল্লা
২) ব্লগার আরিফ জেবতিক
৩) ফেইসবুক গ্রুপঃ আসুন প্রতিবাদ করি এই অন্যায়ের,তুলে ধরি বাংলা ও বাঙ্গালীর ঐতিহ্যকে।
৪) দৈনিক ইত্তেফাক
৫) সাহসের সমাচার