সোমবার, ১০ অক্টোবর, ২০১১

শাড়ি...

আমি টুকটাক লেখালেখি করি। তবে বেশিরভাগ সময়েই সাহিত্য ঘরানার লেখাগুলো ঠিকমত পরিপক্বতা পায় না। আসলে লেখার গভীরতা বাড়ানোর জন্য অনেক বেশি পড়াশোনা করতে হয়। অন্যের লেখা পড়লে, বিশেষ করে ভালো মানের লেখা পড়লে লেখার গুণ, গভীরতা, ব্যপকতা নিশ্চিতভাবেই বাড়ে যদি পড়া লেখাগুলোর কিয়দংশও বোঝা সম্ভব হয়।

আমি আমার আলসেমির দরুন বই পড়াও ছেড়ে দিয়েছি। নানা ব্যস্ততায় ব্লগ পড়াটাও অনেক কমে গেছে। আজ এক বন্ধুর কাছ থেকে পড়ার জন্য একটা বই নিলাম। রাজনৈতিক ভাবে ওপার বাংলার (রাজনৈতিকভাবে দুই বাংলা যতই আলাদা হোক না কেন আমার মনে দুই বাংলা এখনো অভিন্নসত্তা) লেখকের। সুবোধ সরকারের কবিতার বই। এর আগে আমি কখনো সুবোধ সরকার পড়িনি। আমার বন্ধু, সাবিল কবিতাগুলো থেকে কিছু কবিতা আমাকে আবৃত্তি করে শোনালো। তার থেকে একটা কবিতা আমার মাথায় ঘুরছিলো।

বাসায় ফিরে আরো বেশ ক'বার পড়লাম। আমি বাকরুদ্ধ। এই না হল কবিতা! জীবনে এরকম একটা কবিতা লিখতে পারলে লেখালেখির পুরোটাই স্বার্থক। অনেক বেশি মর্মস্পর্শী সে কবিতা। একজন পুরুষ কবি এক হতভাগ্যা-অসহায়া নারীর করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন সে কবিতায়। আমি মনে মনে নিজেকে সেই নারীর জায়গায় বসানোর চেষ্টা করলাম। যদিও একজনের পক্ষে আরেকজনের দুঃখের পুরোটা কোনভাবেই বোঝা সম্ভব না, তারপর আমি একজন পুরুষ! এরপরও পড়তে পড়তে আমার চোখের কোণাটা ভিজে গেল।

কবিতাটা আপনাদের জন্য তুলে ধরছিঃ

শাড়ি
- সুবোধ সরকার

বিয়েতে একান্নটা শাড়ি পেয়েছিল মেয়েটা
অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে আরো ছটা
এতো শাড়ি একসঙ্গে সে জীবনে দেখেনি।

আলমারির প্রথম থাকে সে রাখলো সব নীল শাড়িদের
হালকা নীল একটাকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুই আমার আকাশ
দ্বিতীয় থাকে রাখলো সব গোলাপীদের
একটা গোলাপীকে জড়িয়ে সে বলল, তোর নাম অভিমান
তৃতীয় থাকে তিনটা ময়ূর, যেন তিন দিক থেকে ছুটে আসা সুখ
তেজপাতা রঙ যে শাড়িটার, তার নাম দিল বিষাদ।
সারাবছর সে শুধু শাড়ি উপহার পেল
এত শাড়ি কী করে এক জীবনে সে পরবে?

কিন্তু এক বছর যেতে না যেতে ঘটে গেল সেই ঘটনাটা
সব্ধের মুখে মেয়েটি বেরিয়েছিল স্বামীর সঙ্গে, চাইনিজ খেতে
কাপড়ে মুখ বাঁধা তিনিটি ছেলে এসে দাঁড়ালো
স্বামীর তলপেটে ঢুকে গেল বারো ইঞ্চি
ওপর থেকে নীচে। নীচে নেমে ডানদিকে।
পড়ে রইলো খাবার, চিলি ফিশ থেকে তখনো ধোঁয়া উঠছে।
এর নাম রাজনীতি বলেছিল পাড়ার লোকেরা।

বিয়েতে একান্নটা শাড়ি পেয়েছিল মেয়েটা
অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে আরো ছটা
একদিন দুপুরে, শাশুড়ি ঘুমিয়ে, সমস্ত শাড়ি বের করে
ছ'তলার বারান্দা থেকেউড়িয়ে দিল নীচের পৃথিবীতে।
শাশুড়ি পরিয়ে দিয়েছেন তাঁকে সাদা থান
উনিশ বছরের একটা মেয়ে, সে একা।

কিন্তু এই থানও এক ঝটকায় খুলে নিল তিনজন, পাড়ার মোড়ে
একটি সদ্য নগ্ন বিধবা মেয়ে দৌড়াচ্ছে আর চিৎকার করছে, বাঁচাও
পেছনে তিনজন, সে কি উল্লাশ, নির্বাক পাড়ার লোকেরা।

বিয়েতে একান্নটা শাড়ি পেয়েছিল মেয়েটা।


কবিতাটার ভাষা যতটা সহজ ঠিক ততটাই কঠিন এর বক্তব্য। এর ঘটনাটা কঠিনভাবে বুকের বাম দিকে আঘাত করে। মস্তিষ্কে আঘাত করে, এবং সে আঘাত পৌনঃপুনিকভাবে চলতেই থাকে। আমি সে আঘাত থেকে মুক্তি পাই নি। এলোমেলো ভাবনারা আমাকে আরো কিছুদূর সামনে টেনে নিয়ে গেছে। তাইই তুলে ধরলামঃ

শাড়ি
- দেবাশিস্‌ মুখার্জি

তিনজন দৌড়াচ্ছে, দৌড়াচ্ছে সেই নারীর পেছনে
যে নারীর সিঁথিতে গতকালও সিঁদুর ছিল
নারীদেহ খেতে অনেক মজা, তাই এ সুযোগ ছাড়বে কেন?
সাদা থান কেড়ে নিয়ে হাত বাড়ায় উলঙ্গ বক্ষে
একে একে রক্তাত করে তোলে সারাটা দেহ
নির্বাক পাড়াবাসীর গোচরেই চলে তিন পাষণ্ডের উপভোগ।

তিনজনের পালাবদলে রাতটা পার হয়না সে মেয়ের
ভোরের আলো ফোঁটার আগেই তার জীবন আলোর অস্ত ঘটে
সকাল বেলা হাজির হয় কর্তব্য পরায়ন পুলিশেরা,
একে ওকে জিজ্ঞাস করে, কে এই নারী, ধর্ষিতা নারী!
নির্বাকেরা নির্বাক রয়ে যায়, পুলিশ লাশ নিয়ে ধায়।

আধখাওয়া লাশটার কাটাছেঁড়া চলে, সবশেষে সেলাই,
এর পর মেয়েটার উলঙ্গ দেহে নতুন কাপড় ওঠে, লাশের সাদা কাপড়
পুলিশ লাশটাকে শাশুড়ির কাছে দিয়ে আসে
কিন্তু সে তো একে দিবেনা জায়গা, এ যে অপয়া নারী
একে একে সব নির্বাকেরা সবাক হয়ে ওঠে, বলে, ঠিক ঠিক
সত্যিই ও অপয়া তাই বিয়ের বছর না পেরুতেই স্বামীকে খেলো,
আর কোন ভালো মেয়েকে কি কেউ এভাবে খায়!

এত শাড়ির মালিক হয়েও একটা শাড়ি জোটে না সে মেয়ের
একটা সাদা থানে চিতায় নিতেও নারাজ বুড়ো শাশুড়ি,
কারণ ওর জন্যই যে ওর খোকা মরেছে!
সরকারি কাপড় গায়ে ইলেক্ট্রিক চিতা জলে গঙ্গার ধারে,
কাপড়ের ছায়ারা এখনো ওড়ে রাতের আধাঁরে।


শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০১১

মাদকতা!


তুই খেয়ে চল স্কচ, রাম, ভদকা,
আর আমি খাবো তোর মাদকতা।
মাদকতা মাখা ঐ চোখ দুটোতে
আমি যাই চলে প্রেমের শুরুতে...

নতুনের শুরু, হারানো কিছু ভুলে
নাকটা গুঁজি তোর ঐ ছাড়া চুলে,
মাদকতার ঘ্রাণে পাগল এ আমি,
তোকে ঘিরেই ফের পাগলামি...


কোলে নিয়ে চলি ঐ ছাদের 'পরে,
তোর খোলা চুল ওড়ে ধুলি ঝড়ে,
এরপর নামে বৃষ্টি, কাঁদে আকাশ,
তুই আর আমি হই ভেজা কাক...

কাঁপছি, কোন এক শীতল নিশীথে,
ছাদের 'পরে, বসে ঐ ঠাণ্ডা মেঝেতে,
কালপুরুষ খোঁজে দুইজোড়া চোখ,
ভুলে যেতে চায় পেছনের শোক...


তবু থাকে জল চোখের কোণে
আর পুরোনোরা রয় অবচেতনে
মেনি আর হুলো রাখে কাঁধে কাঁধ
ভালোবাসতে জাগে বড় সাধ...

তবু মনে থাকে ভয় পাথর হবার
হবে কি পাথর দুজনায় আবার??
.......................................


১২ আগস্ট, ২০১১; ঢাকা
দেবাশিস্‌ মুখার্জি

সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১১

ইন্দো-বাংলা সম্পর্ক: সীমান্ত - ০১: ইন্দো-বাংলা যুদ্ধ!!

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ ছাগু ও ভাদারা নিরাপদ দূরত্বে থাকুন। আসলেই গদাম!!
 

অনেকদিন পর এই সিরিজটায় হাত দিলাম। যাদের পড়া হয় নি কিংবা যারা সময়ের স্রোতে ভুলে গিয়েছেন তাদের জন্য এই সিরিজের আগের পর্বের লিঙ্কগুলো তুলে ধরলামঃ

অকৃত্রিম বন্ধু ভারত - ০১ : নদ-নদী - ০১ : ভারতের তিস্তা-মহানন্দা শোষণ
 
অকৃত্রিম বন্ধু ভারত - ০১ : নদ-নদী - ০২ : গঙ্গা-পদ্মা দরকষাকষি ও আমার প্রস্তাবনা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় প্রতিবেশী ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। ভারতের সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতাটা অসম্ভব না হলেও এতটা সহজে হত না। ৩০ লাখ প্রাণ আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের পরেও বলবো আমরা খুব কম সময়েই আমাদের স্বাধীনতা পেয়েছি। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই নানা টানাপোড়েনে বন্ধুত্বের পথটা মসৃণ হয় নি। ভারত বরং তার দাদাগিরিই অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশ-ভারতের মাঝে যদিও কোন যুদ্ধ হয় নি, তবে যুদ্ধের কাছাকাছি উত্তপ্ত অবস্থা ঠিকই তৈরি হয়েছে, যদিও তার পরিমাণ হাতে গুণে কয়েকবার। ঐ ঘটনাটাকে যুদ্ধ না বলে সংঘর্ষ বলাই শ্রেয় (তবু কেন শিরোনামে যুদ্ধ শব্দটা ব্যবহার করেছি তা পুরো পোস্ট পড়লেই জানতে পারবেন)। ইন্দো-বাংলার সেই সংঘর্ষ নিয়েই আজকের পর্ব লিখলাম।

ভেতরের ঘটনা যাই হোক, বাহ্যিক ভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারকেই 'ভারতের দালাল' অপবাদ সহ্য করতে হয়। আর এই রটনা রটানোর গুরু দায়িত্ব পালন করে বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা দলগুলো, এবং দেশের জনসংখ্যার বেশ বড় একটা অংশ তা বিশ্বাসও করে। কিন্তু এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল আওয়ামী সরকারের সময়েই এবং তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা!
 
কথা না বাড়িয়ে মূল কথায় যাই। ঘটনার সময়কাল ২০০১ সালের ১৬ - ২০ এপ্রিল এবং ঘটনাস্থল বাংলাদেশ আর ভারতের আসাম ও মেঘালয় সীমান্ত। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয় যে ওপারের বিএসএফ আমাদের কুড়িগ্রাম এর রৌমারি সীমান্তে টহলরত বিডিআরকে হঠাৎ করেই আক্রমণ করে আর তাই বাংলাদেশ আর্মির সদস্যরা ওদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। আর বিএসএফ তরফ থেকে জানানো হয় বিডিআর বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে এক গ্রাম দখল করার চেষ্টা করে যা মূলত ভারতের জায়গা!!






এই সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ বিডিআর এর ২ জন সদস্য মারা যান। আর বিএসএফ এর ১৬ জন সদস্য মারা যান। বাংলাদেশ বিডিআর শুরুতেই লাশ হস্তান্তর করতে রাজি হয় নি। পরে তারা তা করতে বাধ্য হয়। ভারত সরকার এর তরফ থেকে দাবি করা হয় যে বিএসএফ সদস্যদের হয় অত্যচার করে মারা হয়েছে কিংবা হত্যার পর তাদের লাশ বিকৃত করা হয়েছে। আর এর উত্তরে বিডিআর বলেছে ওদের লাশগুলোতে গরমে পচন ধরেছে। ভারত সরকার বলেছে যুদ্ধকালীন অবস্থায় বিপরীত পক্ষের সেনাদের লাশ বিকৃত করা জেনেভা কনভেনশন বিরোধী। আর দুই প্যরামিলিটারি বাহিনীর সংঘর্ষে বাংলাদেশের সেনার হস্তক্ষেপ নিয়মবিরুদ্ধ। ভারত জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচারও দিতে চেয়েছিল। পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারো বাজপেয়ীর আলাপচারিতায় পরিস্থিতি শান্ত হয়।


স্বল্প সময়ের এই যুদ্ধে ফলাফল হল 'Status quo ante bellum', যার মানে যুদ্ধের আগের সীমানতে ফিরে যাওয়া। এর দুদিন বাদেই বিএসএফ তথা ভারত দাবী করে যে বাংলাদেশ ঐ সীমান্তে তার সেনা বাড়াচ্ছে এবং তা নাকি ২০০০০ এরও বেশি!! বাংলাদেশ সরকার অথা বিডিআর এর তরফ থেকে তৎক্ষণাৎ জবাব দেওয়া হয় ওখানে তাদের রুটিন ওয়ার্ক চলছে, আর বাংলাদেশের কোথাও কত সেনা থাকবে তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার!!



বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে ঐ সীমান্তে থাকা কোন বিডিআর সদস্য কিংবা সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল কিংবা সান্সপেন্ড করার মত কোন ঘটনা ঘটেনি। তবে বাংলাদেশে রাজনীতিতে অনেকেই এটা নিয়ে মিথ্যা কাহিনী প্রচার করে ফায়দা লুটার চেষ্টা করেছে।

 

জাতীয় নির্বাচনের আগ দিয়ে এই ঘটনা আওয়ামী সরকারকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। লীগ সরকার উভয় সংকটে পরে যায়। এই ঘটনায় যদি সত্যিই বাংলাদেশ আর্মির ঐ মেজরের দোষ হয়ে থাকে তবে তার পেছনে বিএনপি-জামায়াত জোটের ইন্ধন থাকলে অবাক হব না!!
 

সবশেষে কিছু কথা না বললেই না। ঐটাও আমাদের সেনা, আমাদের বিডিআর ছিল। আর এখন যারা সীমান্ত পাহাড়া দিচ্ছেন তারাও তাই (যদিও বিডিআর এর নাম বদলে বিজিবি হয়েছে), তখনও যিনি প্রধানমন্ত্রী চিলেন, এখনও তিনিই প্রধানমন্ত্রী আছেন। কিন্তু এখন আমাদের সীমান্তে কী ঘটে চলছে??!! কোন এক অজানা জাদুবলে (!!!) আমাদের বিজিবি সদস্যদের হাতে চুড়ি পরিয়ে রাখা হয়েছে!!!